লাগেজভর্তি ডলার নিয়ে সিঙ্গাপুরে একদিনে হারিয়েছেন ৪৫ কোটি টাকা

সম্রাটের স্ত্রীর কথাই সত্যি। ক্যাসিনো কিং খ্যাত বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের প্রধান ও একমাত্র নেশা ছিল জুয়া। খেলতে যেতেন সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে ক্যাসিনোতে। সঙ্গে নিতেন লাগেজভর্তি ডলার।ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে বিমানে উঠতেন সম্রাট। তার লাগেজ চেক করা দূরের কথা কখনই তাকে দেহতল্লাশির মুখোমুখিও হতে হয়নি। ক্যাসিনোতে তিনি দু’হাতে টাকা উড়ান। কখনও হারেন, কখনও জেতেন। একদিনে ৪৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খুইয়েছেন জুয়ার বোর্ডে।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে নিজের জুয়ার নেশা থেকে শুরু করে ঢাকার ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের আদ্যোপান্ত সবিস্তারে খুলে বলছেন সম্রাট। তার গডফাদার কে, কিভাবে তিনি ক্যাসিনো জগতে এলেন এবং জুয়ার টাকা কার কার পকেটে গেছে সবার নামই তিনি বলছেন।জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া নামগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে নামের তালিকা পাঠানো হচ্ছে সরকারের উচ্চপর্যায়ে। তবে অকপটে সব খুলে বললেও অসুস্থ সম্রাটকে টানা দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছে না।বিরতি দিয়ে তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে র‌্যাব হেফাজতে তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও চলছে। সূত্র জানায়, ক্যাসিনোকিং সম্রাট ও আরমানকে জিজ্ঞাসবাদে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের উচ্চপর্যায়কে অবহিত করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করছে র‌্যাব। একই সঙ্গে সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে শুদ্ধি অভিযান চালানো হচ্ছে। এদিকে রিমান্ডে থাকা আরেক যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমান র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।তিনিই মূলত সম্রাটের ক্যাসিয়ার এবং প্রধান সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। আজ আরমানের রিমান্ড শেষ হওয়ায় তাকে আরেক দফা রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করবে র‌্যাব।সূত্র বলছে, ক্যাসিনো কিং সম্রাটের অর্থ-সম্পদের একটি লম্বা ফিরিস্তি পাওয়া গেছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে টাকা জমা রেখেছেন সম্রাট। তার ভাই বাদলের নামে রাজধানীর আশপাশে কয়েকটি প্লট ও ফ্ল্যাট কিনে রেখেছেন তিনি।

এছাড়া ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের জনৈক নেত্রী মৌসুমির সঙ্গে সম্রাটের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মৌসুমির নামে পুলিশ প্লাজায় একাধিক দোকান কিনেছেন। যুবলীগ নেতা খালেদ ও আরমানের বিপুল অংকের টাকা আছে থাইল্যান্ড, দুবাই ও সৌদি আরবে।জুয়ার টাকায় আরমান সিনেমা প্রযোজনা শুরু করেন। দেশবাংলা চলচিত্র নামে একটি প্রডাকশন হাউস খোলেন তিনি। সিনেমা জগতে নাম লেখানোর পর আরমানের সঙ্গে শিরিন শিলা নামের জনৈক চিত্রনায়িকার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।প্রথমে বন্ধুত্ব হলেও পরে শিলার সঙ্গে আরমানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় শিলার নামে একাধিক ফ্ল্যাট কেনেন আরমান।

র‌্যাব জানায়, সম্রাটের অস্ত্র ভাণ্ডারের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কারণ বিভিন্ন সূত্রে খবর এসেছে সম্রাটের কাছে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে তার কাছে একাধিক একে-৪৭ ও একে-২২ রাইফেল আছে। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সম্রাটের অস্ত্র ভাণ্ডারের তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।ইতিমধ্যে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার অস্ত্রধারী ক্যাডারদের একটি তালিকা তৈরি করেছে র‌্যাব। অর্ধশতাধিক ক্যাডার বাহিনীর প্রত্যেকের কাছেই একের অধিক বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করতেন খালেদ।তার ব্যক্তিগত গাড়িতে সার্বক্ষণিক ১০-১৫টি পিস্তল ও শটগান থাকত। কথায় কথায় তিনি গুলি ফুটিয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতেন।সম্রাট ও আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম রোববার বলেন, ‘আমরা সম্রাটের কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।সম্রাটই ঢাকার ক্যাসিনো জগতের প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার মাধ্যমেই প্রভাবশালী মহলে বিপুল অংকের অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়েছে। আপনারা জানেন, যেখানেই অঢেল অর্থ সেখানেই অবধারিতভাবে অস্ত্র, মাদক ও নারী সম্পৃক্ততা চলে আসে।সম্রাটের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া সব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সমীচীন হবে না। কারণ সম্রাটের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাটি এখনও বিচারাধীন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য গণমাধ্যমে এলে তদন্তে বিঘ্ন ঘটতে পারে।সূত্র জানায়, র‌্যাবের তৎপরতা এখন শুধু ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আরও বহুমুখী অভিযান চালাচ্ছে র‌্যাব। শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে মোহাম্মদপুরের আতঙ্ক কাউন্সিলর রাজিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজিবের বিরুদ্ধে গরুর হাট থেকে শুরু করে বড় বড় নির্মাণকাজের টেন্ডারবাজির অভিযোগ আছে। চাঁদাবাজির মাধ্যমে রাজিব স্বল্প সময়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। রাজিব ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন সরকারদলীয় কাউন্সিলর নজরদারিতে আছেন।ইতিমধ্যে তাদের অপরাধ প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। চলতি মাসেই এদের কেউ কেউ ধরা পড়বেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেননসহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও ডাকসাইটে সংসদ সদস্য ক্যাসিনো থেকে মাসোহারা পেতেন। মেনন প্রতি মাসে পেতেন ১০ লাখ টাকা। ক্লাবপাড়ার বিভিন্ন ক্যাসিনো থেকে টাকা তুলে মেননের কাছে পৌঁছে দিতেন যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *