আত্মবিশ্বাস নিয়ে বার্মিংহামে

তামিম ইকবালের কৌতুকে অট্টহাসির রোল, ‘আমার জীবনের সেরা বিশ্বকাপ এটা। আর কোনো টেনশন নেই!’ অন্তত গোটা দুয়েক সেঞ্চুরির প্রত্যাশা যাঁর কাছে, এবারের বিশ্বকাপে ৬ ইনিংসে ২০৫ রান করেই তাঁর মনে এমন উচ্ছ্বাসের ঢেউ ওঠার কারণ নেই। তবে এটা ঠিক যে বিশ্বকাপের কোনো একটি আসরে এটাই তামিমের সর্বোচ্চ রান। আগের তিনটিতে যথাক্রমে ১৭২, ১৫৭ ও ১৫৪। তাই তিনি ধরেই নিয়েছেন, ‘ভাই, বিশ্বকাপ আমার জন্য নয়!’একটার পর একটা গ্র্যান্ড স্লামজয়ী রজার ফেদেরারও কি বন্ধুমহলে ফ্রেঞ্চ ওপেনের আগে এমন কৌতুক করতেন? তাঁর জেতা ২০ গ্র্যান্ড স্লামের মাত্র একটা ক্লে কোর্টের, সেটাও ২০০৯ সালে উইম্বলডন, ইউএস এবং অস্ট্রেলিয়ান ওপেন মিলিয়ে ১৪টা ট্রফি জয়ের পর! তাই টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে ঘনিষ্ঠরা জোর আশ্বাস দেন তামিমকে, ‘হবে। হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই বড় ইনিংসটা আসবে।’সেই ইনিংসটা কি তামিমের ব্যাটে আসবে ২ জুলাই? ক্রিকেটবিশ্ব তাঁকে চিনেছিল ত্রিনিদাদের সেই ৫১ রানের ইনিংস দেখে। প্রতিপক্ষ ভারত। ২০১১ বিশ্বকাপে তামিমের একমাত্র ফিফটিও একই প্রতিপক্ষের সঙ্গে। ২০১৫-তেও একটা ফিফটি, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। সেবার ভারতের বিপক্ষে আউট হয়ে গিয়েছিলেন ২৫ রান করে। সব মিলিয়ে তামিমের বিশ্বকাপ ব্যাটিং গড় ২৫.৪৮, যেখানে ক্যারিয়ার গড় ৩৬.১৯। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ২৭ ম্যাচে তাঁর রান ৬৮৮। অথচ ২০১৫ ও ২০১৯ বিশ্বকাপের মাঝের চার বছরে যা ৫৪.৩৯, গড়ে ২১২১।অবিশ্বাস্য বৈপরীত্য তাঁর বিশ্বকাপ এবং দ্বিপক্ষীয় কিংবা অন্য কোনো টুর্নামেন্টে তামিম ইকবালের ব্যাটিং নৈপুণ্যে। বিশ্বকাপ এলে কী হয়?‘আমি জানি না, ভাই। আর জানতেও চাই না, যা হওয়ার হবে’—বলেই নিজেই হাসিতে ভেঙে পড়েছেন পরশু রাতে। অথচ এই তিনি বিশ্বকাপ শুরুর আগে সর্বত্রই ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ ঝুলিয়ে ঘুরেছেন। হন্যে হয়ে বিশ্বকাপে ব্যাটে ঝড় তোলার শপথ নিয়েছেন প্রতিনিয়ত। আগের বিশ্বকাপের ব্যর্থতা ভুলতে ইংল্যান্ডের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলেননি শরীরকে বিশ্রাম দিতে। ওজন কমানোর পাশাপাশি ফিটনেস নিয়েও কাজ করেছেন। ব্যাটিং যে খারাপ করছেন, সেটা কেউ বলছে না। তবে একটা ভুলেই ভালো ব্যাটিং থেমে যাচ্ছে প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে।ক্রিকেটে ভাগ্য লাগে। মাশরাফি বিন মর্তুজা একবার সংবাদ সম্মেলনেই বলেছিলেন, ‘তামিম যতই কষ্ট করুক, ভাগ্যে যদি না লেখা থাকে তাহলে এ পর্যন্ত যে রান করেছে, টুর্নামেন্টের পরের অংশেও অত রান করতে পারবে না।’ ভাগ্যের সাহায্য ছাড়াই অবশ্য একটা ফিফটি করেছেন তামিম। পরশু রাতে প্রাণখোলা হাসিতে বলছিলেন, ‘ম্যাচের (আফগানিস্তানের বিপক্ষে) পর মাশরাফি ভাইয়ের সঙ্গে কোলাকুলি করেছি। আমার আর উনার তো সমান সমান! আমার একটা ফিফটি, উনার একটা উইকেট!’সাউদাম্পটনে তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টি ক্লেদ ধুয়ে নেয়। তামিমের মন থেকে বিশ্বকাপ টেনশনও কি কেড়ে নিল? যিনি এত দিন মেপে কথা বলছিলেন, তিনি আচমকা এতটা উচ্ছল হয়ে উঠলেন কী করে?উত্তরটা টাইটানিকের শহরের লিওনার্দো রয়্যাল হোটেলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে। সাউদাম্পটনে বাংলাদেশ দলের এ ঠিকানার নাম দৈর্ঘ্যে ব্রাজিলিয়ান কিংবা শ্রীলঙ্কান নামের সঙ্গে মানানসই। লিওনার্দো রয়্যাল সাউদাম্পটন গ্র্যান্ড হারবার! এখানকার লোকে সংক্ষেপে লিওনার্দো হোটেল বললেই চট করে চিনে ফেলে। তো, গত তিনটা দিন এ হোটেল অল বাংলাদেশ কমিউনিটিতে রূপ নিয়েছিল। মনে চাপা টেনশন নিয়ে। টেনশনই তো। আফগানিস্তানের কাছে হারলে দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বীরত্বের নিকুচি করবে জনতা। এক দিন আগে ভারতকে প্রায় ধরে ফেলা আফগানরা কী করে না করে, ঠিক নেই। কিন্তু আরেকটি ‘সাকিবীয়’ ম্যাচ সব টেনশন ধুয়ে-মুছে ফেলেছে কাছের সমুদ্রে, যেটাকে কর্ণফুলীর চেয়েও ছোট মনে হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে খেলা দেখতে আসা এক বাংলাদেশির!প্যারিস যাবেন, তাই পরশু রাতেই লন্ডনে চলে গেছেন সাকিব আল হাসান। এ জন্য একজন অধিনায়ককে কম পাওয়া গেছে সাউদাম্পটনে বিশ্বকাপের শেষ রাতে। হোটেলের রেস্টুরেন্টে জমিয়ে আড্ডা দিয়েছেন সাবেক চার অধিনায়ক—মিনহাজুল আবেদিন, আকরাম খান, নাঈমুর রহমান ও খালেদ মাহমুদ। যিনি শহর ছেড়ে চার দিনের জন্য চলে গেছেন, তিনিই আড্ডার মূল বিষয়বস্তু। সাকিব যে বিরামহীন ভালো খেলে যাচ্ছেন, তা নিয়ে মুগ্ধতার সঙ্গে মিশে অপার বিস্ময়। তাঁদের আড্ডায় পরিচিত প্রবাসী যেমন ছিলেন, তেমনি অচেনা স্বদেশিরাও এসে টপাটপ সেলফি তুলেছেন। কোথাও উদ্বেগের ছিটেফোঁটাও নেই। বরং ভারত ও পাকিস্তানকে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় ট্যুর প্ল্যানও নতুন করে সাজানোর চিন্তার কথা শোনা গেছে। তবে সব সম্ভাবনার চেয়েও বেশি উচ্চারিত হয়েছে আফগান চাপমুক্তির উচ্ছ্বাস। বিশ্বকাপ সেমির সম্ভাবনার জীবন-মৃত্যুর আগে এ জয়টাই যেন বেশি প্রভাবিত করেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটসংশ্লিষ্টদের।ছুটির ঘোষণা আগেই দেওয়া হয়েছিল। তাই মোহাম্মদ মিঠুন রাতেই চেক আউট করে চলে গেছেন ব্রিস্টলে। ওখানে তাঁর ভাই থাকেন। মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনও পরিচিতজনদের সঙ্গে বেরিয়ে গেছেন। গতকাল সকালে তামিম গেছেন লন্ডনে। সকালে বার্মিংহামের টিম বাসে তাই কিছু জায়গা ফাঁকাই থেকেছে।অবশ্য সাউদাম্পটনে টেনশন ফেলে ভরপুর আত্মবিশ্বাস ঠিকই গেছে মাশরাফিদের সঙ্গে। আর দুটো মাত্র সিঁড়ি—ভারত ও পাকিস্তান। ওই সিঁড়ি দুটো ভাঙতে পারলেই তো খুলে যাবে স্বপ্নদ্বার!

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *